কম্পন


 পরীক্ষা দিচ্ছি। হঠাৎ মৃদু ধাক্কা। তারপর আবার। 

ভূমিকম্প! আমি তিন তলায় বসে আছি। প্রবল কম্পনে কাঁপছে ভবন।মতিঝিল আইডিয়াল কলেজ! 

একটা পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছি। ভবন কাঁপছে। আমার মনে হচ্ছে উপরের বাকি দুটি তলা ভেঙে যাবে। আমাকে নিয়ে ধ্বসে যাবে ভবন। শুধু দুটি কথা মনে হলো। আমার ছেলেটা তার বাবার কোন স্মৃতি মনে করতে পারবে না। ১৭ মাসের এই সাহসী ছেলেটি, যাকে ছেড়ে আসার সময় সে শরীরের সম্পূর্ণ জোর দিয়ে তার বাবাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। বাবার আগমনে উদ্দ্বেলিত, আহ্লাদিত হয়ে উঠে। দুনিয়ার কোন সৌন্দর্য তার সামনে ম্লান হয়ে উঠে যখন তার বাবা এসে পড়ে তার সামনে। বাবা তার আর বাড়ি ফিরবে না!

মা-বাবার কথা মনে পড়লো। আমি এমন এক জায়গায় মারা যাবো, তারা জানবেন ও না। আমি একটা ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে আছি। আমার মাথার উপরে যে চ্যাপ্টা জং ধরা গ্রিল আছে। সেই লোহাগুলো কি চোখমুখ দিয়ে ঢুকে যাবে? 

কালেমা শাহাদাত পাঠ করছি। মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি। অপেক্ষা করছি উপর থেকে ছাদ ধ্বসে পড়ার। নারীদের কানফাটা চিৎকার এই ঘটনার আবশ্যম্ভাবনা আরো স্পষ্ট করছে। 

ভয় লাগছে?  না ভয় ঠিক না। 

আমি একদিন পৃথিবীতে ছিলাম। আমার জন্মদিনের খুব কাছের একটা দিনে আমি বাড়ি থেকে বহুদূরে এক ভবন ধ্বসে মারা যাচ্ছি। 

আমার ছোট্ট অবুঝ শিশু, প্রেরনাদাত্রী স্ত্রী,মমতাময়ী মা,অভিমানী ভাই, আর আবেগপ্রবণ বাবা আমার কথা জানতেও পারবেন না। 

আতংকিত লাগছে। ১ম ধাক্কা শেষ হয়ে গেছে। ২য়বার আবার কাঁপবে ভবন। এটা ভাবছি। পরীক্ষা দিচ্ছি। শুধু একটা অঙ্কের রেজাল্টে একটা যোগ ভুল হলো।

ভূমিকম্প থামলো। ২য় ধাক্কা বলতে কিছু হলো না। আমি বাইরে বের হলাম। তাৎক্ষণিক মৃ*ত্যুর প্রস্তুতি নিতে মানুষের কেমন লাগে, সেই অভিজ্ঞতা হলো। 


মতিঝিলে হাঁটলাম। বায়তুল মোকাররমে জুমা পড়লাম। খতিব সাহেবের সরল সম্মোহনী বক্তৃতা শুনলাম। পল্টনের দোকানীদের পন্যের পশরার মাঝে হাঁটলাম। বইয়ের দোকানগুলোর পাশে হাটলাম। বই কিনলাম না তেমন। শুধু একটা আরবী শেখার বই কিনেই শান্ত থাকলাম। কমলাপুর স্টেশন মেহগনীতলায় বসে আছি। বাড়ি ফিরবো। 

আজ অজস্র মানুষের অন্তরে যে ঝড় বয়ে গেলো, আল্লাহ তাদের দ্বীনের সমঝদার করুন।

0 Comments:

Post a Comment

Designed by OddThemes | Distributed by Gooyaabi